কভিড মহামারীর আগে তিন দশক ধরে দেশে দারিদ্রের হার কমছিল। অর্থাৎ দারিদ্র্য হ্রাসে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দারিদ্র্যের হার ক্রমাগতভাবে বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর দেশের দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২১ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছবে, যা কভিড-পরবর্তী চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০২৪ সালে এ হার ছিল ২০ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। এর আগে দেশে দারিদ্র্য বাড়ার তথ্য দিয়েছিল বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। চলতি বছরের জানুয়ারিতে বিবিএসের দেয়া তথ্য অনুযায়ী দারিদ্র্যের হার ১৯ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২২ সালে খানা আয়-ব্যয় জরিপ অনুযায়ী দেশের দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। অন্যদিকে পিপিআরসির সমীক্ষায় উঠে এসেছে, দেশের দারিদ্র্য বেড়ে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে পৌঁছেছে। সংস্থাটির সমীক্ষায় অতিদারিদ্র্যের হার ২০২২ সালে ছিল ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তিনটি সংস্থার পরিসংখ্যানই বলছে, দেশে আশঙ্কাজনকভাবে দারিদ্র্যের হার বাড়ছে। এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় সতর্কবার্তা। এমনকি এটি দেশের আর্থসামাজিক অগ্রযাত্রা পিছিয়ে যাওয়ার লক্ষণও। একটি দেশের দারিদ্র্য যখন বাড়তে থাকে, তা শুধু অর্থনৈতিক দুর্দশার চিত্রই তুলে ধরে না, বরং সে দেশের অর্থনীতির ভিত কতটা দুর্বল, বৈষম্যমূলক ও অনিরাপদ তাও স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় অর্থনীতির মূল ধারায় তাদের অংশগ্রহণ কমে যাচ্ছে। বিরাজমান উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে বিপুল পরিমাণ মানুষ মৌলিক চাহিদা পূরণেও হিমশিম খাচ্ছে।
মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, বিনিয়োগহীনতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণেই দেশে দারিদ্র্যের হার বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরেই দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজমান। উচ্চ মূল্যস্ফীতি কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়েছে। খাবার, চিকিৎসা, বাসাভাড়া ও শিক্ষাসহ প্রতিটি খাতেই ব্যয় বেড়েছে। ফলে দরিদ্র থেকে মধ্যবিত্ত পর্যন্ত সবাই আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য রাখতে পারছেন না।
তিন বছরের বেশি সময় ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। বিবিএসের তথ্য বলছে, গত আগস্টের চেয়ে সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি কিছুটা বেড়েছে। গত মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। গত আগস্টে এ হার ছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। ফলে মূল্যস্ফীতি আবার বাড়তি ধারায় এল। কয়েক মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ঘরে আছে। উচ্চমূল্যস্ফীতি দারিদ্র্য হারকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। এটি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। কারণ ব্যয়ের সঙ্গে আয় সেভাবে বাড়ে না। যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র—যেমন চাল, ডাল, তেল, ওষুধ, পোশাক ইত্যাদির দাম বেড়ে যায়, তখন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের সীমিত আয় দিয়ে এসব প্রয়োজনীয় জিনিস কেনা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে তারা কম খায় ও কম খরচ করে। এমনকি অনেক সময় চিকিৎসা বা শিক্ষার মতো মৌলিক চাহিদাও পূরণ করতে পারে না। অনেক পরিবার তখন বাধ্য হয়ে ধার করে, সঞ্চয় ভেঙে ফেলে বা সম্পদ বিক্রি করে। একপর্যায়ে এ পরিবারগুলো দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে পড়ে। অন্যদিকে যারা আগে থেকেই দরিদ্র ছিল, তাদের অবস্থা আরো খারাপ হয়। এভাবে মূল্যস্ফীতির ফলে মানুষের জীবনযাত্রার মান নেমে যায় ও দেশের সামগ্রিক দারিদ্র্য হার বেড়ে যায়।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কয়েকবার নীতি সুদহার বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বর্তমানে নীতি সুদহার ১০ শতাংশ রয়েছে। সাধারণত বাজারে অর্থপ্রবাহ বেড়ে গেলে এবং সে কারণে মূল্যস্ফীতি বাড়লে, অর্থপ্রবাহ কমাতে নীতি সুদহার বাড়ানো হয়। নীতি সুদহার বেড়ে গেলে দেশের ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে নিরুৎসাহিত হয়। আবার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের যে ঋণ দেয়, তার সুদহারও বেড়ে যায়। এতে গ্রাহকরাও ঋণ গ্রহণে নিরুৎসাহিত হয়। বলাবাহুল্য, বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি মুদ্রা সরবরাহজনিত কারণে নয়, বরং বাজার ব্যবস্থাজনিত। ফলে নীতি সুদহার বাড়িয়েও মূল্যস্ফীতিতে খুব একটা প্রভাব দেখা যাচ্ছে না।
সুদের হার বেশি হওয়ায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ঋণ গ্রহণের হার কমে গেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ৯ দশমিক ৮ শতাংশ। কিন্তু বিনিয়োগ স্থবিরতায় এক অংকের এ লক্ষ্যও অর্জিত হয়নি। অর্থবছর শেষে এ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে মাত্র ৬ দশমিক ৪০ শতাংশ। বিনিয়োগ খাতে স্থবিরতা দেখা দেয়ায় কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সুদের হার বেড়ে গেলে ঋণপ্রবাহ কমে যায়। ফলে উদ্যোক্তারা নতুন শিল্প বা ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে আগ্রহ হারান। এতে শুধু নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। এছাড়া দেশে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজমান। এটিও বিনিয়োগে এক ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। বিনিয়োগ কম হওয়ায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা (এসএমই) সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছেন। পর্যাপ্ত ঋণের অভাবে তাদের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেকেই অর্থের সংস্থান না করতে পেরে ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজন ব্যবসাবান্ধব আর্থিক নীতি, সুদের হার সহনীয় পর্যায়ে রাখা এবং ঋণ প্রাপ্তির প্রক্রিয়া সহজ করা। অন্যথায়, বিনিয়োগের নিম্নগতি ও কর্মসংস্থানের সংকট দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্যের হার আরো বাড়াবে।
কর্মসংস্থানের অভাবে দেশে প্রতি বছরেই বেকারত্ব বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে দেশের শ্রমবাজারের দুর্বল চিত্র উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, ২০২৩-২০২৪ সাল পর্যন্ত শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৬০ দশমিক ৯ থেকে ৫৮ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ দেশে কর্মক্ষম জনশক্তির মধ্যে যারা কর্মে নিয়োজিত ছিলেন তাদের মধ্যে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে, যার মধ্যে প্রায় ২৪ লাখই নারী। এ পরিস্থিতিতে কর্মসংস্থান ও কর্মক্ষম জনসংখ্যার অনুপাত ২ দশমিক ১ শতাংশীয় পয়েন্ট কমে ৫৬ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিবিএসের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বেকারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৬ লাখ ২০ হাজার। যদিও বিবিএসের দেয়া পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে অর্থনীতিবিদদের। তাদের মতে, সরকার যে হিসাব দেয়, প্রকৃত বেকারের সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি। অনেকেই মনমতো কাজ পান না। তারা পড়াশোনা করেন না, কাজেও নেই। তারা ছদ্মবেকার।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। নীতি সুদহার কমিয়ে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃজন করতে হবে। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি। সর্বোপরি, মূল্যস্ফীতি না কমলে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে দারিদ্র্য হ্রাসের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনও কঠিন হয়ে পড়বে।